নিলামের গাড়ির ঘোষিত দাম দেখে অনেকেরই মনে হয়, বাজারদরের চেয়ে অনেক কমে পছন্দের গাড়ি পাওয়া যাবে। কখনও তা সত্যি। কিন্তু গাড়ি নিলাম বাংলাদেশে সেরা সুযোগ তখনই হয়, যখন আপনি শুধু বিডের দাম নয়, গাড়িটির প্রকৃত অবস্থা, কাগজপত্র এবং নিলাম-পরবর্তী খরচও হিসাব করেন। কারণ নিলামে কেনা গাড়ি সাধারণ বিক্রেতার কাছ থেকে কেনা গাড়ির মতো সবসময় পরীক্ষা, দরকষাকষি বা ফেরত দেওয়ার সুযোগ দেয় না।
ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা বা বিভিন্ন নিলাম আয়োজনকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গাড়ি নিলামে আসতে পারে। এসব গাড়ির মধ্যে ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা ব্যক্তিগত গাড়ি যেমন থাকে, তেমনি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা, দুর্ঘটনাগ্রস্ত বা কাগজের জটিলতাসহ গাড়িও থাকতে পারে। তাই কম দামের সম্ভাবনার সঙ্গে ঝুঁকিটিও বাস্তব।
গাড়ি নিলাম বাংলাদেশে কীভাবে কাজ করে
সাধারণত নিলামকারী প্রতিষ্ঠান আগে গাড়ির তালিকা, প্রদর্শনের সময়, অংশগ্রহণের নিয়ম এবং বিডের তারিখ জানায়। আগ্রহী ক্রেতাকে অনেক ক্ষেত্রে নিবন্ধন করতে হয় এবং জামানত বা আর্নেস্ট মানি জমা দিতে হয়। নির্ধারিত দিনে সর্বোচ্চ দরদাতা গাড়িটি কেনার অধিকার পান, এরপর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পুরো অর্থ পরিশোধ করতে হয়।
তবে প্রতিটি নিলামের নিয়ম এক নয়। কোথাও বিডের আগে গাড়ি সরেজমিনে দেখা যায়, কোথাও সীমিত সময় দেওয়া হয়। কোথাও অনলাইনে দর দেওয়া যায়, আবার কোথাও উপস্থিত থাকতে হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই গাড়ি ‘যে অবস্থায় আছে, যে স্থানে আছে’ ভিত্তিতে বিক্রি হয়। অর্থাৎ নিলাম জেতার পর ইঞ্জিন, গিয়ারবক্স, এসি বা অন্য কোনো ত্রুটি ধরা পড়লেও বিক্রেতা মেরামতের দায় নাও নিতে পারেন।
এই কারণেই নিলামের কাগজে লেখা শর্তগুলো ছোট অক্ষরের আনুষ্ঠানিকতা নয়। সেগুলোই আপনার দায়, খরচ এবং অধিকার নির্ধারণ করে।
বিড দেওয়ার আগে ১০টি জরুরি যাচাই
১. রিজার্ভ প্রাইস নয়, মোট খরচ ধরুন
নিলামের শুরু মূল্য বা রিজার্ভ প্রাইস দেখে বাজেট ঠিক করবেন না। আপনার চূড়ান্ত খরচের মধ্যে থাকতে পারে বিডের মূল্য, ভ্যাট বা প্রযোজ্য কর, নিলাম ফি, কাগজ হস্তান্তর ব্যয়, মালিকানা পরিবর্তন ফি, বকেয়া জরিমানা, মেরামত, টায়ার, ব্যাটারি এবং গাড়ি পরিবহনের খরচ।
উদাহরণ হিসেবে, ১০ লাখ টাকায় বিড জেতা গাড়িতে যদি ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার জরুরি মেরামত এবং অন্যান্য ফি লাগে, তাহলে সেটি ১১ লাখ ৫০ হাজার টাকার গাড়ি। একই মডেল, একই বছরের গাড়ি খোলা বাজারে কত দামে বিক্রি হচ্ছে, তা আগে তুলনা করুন। GarirHat-এর মতো সংগঠিত মার্কেটপ্লেসে মিল থাকা মডেল, বছর, মাইলেজ ও অবস্থার গাড়ির দাম দেখলে বাস্তবসম্মত একটি সীমা নির্ধারণ সহজ হয়।
২. কাগজপত্রের মালিকানা পরিষ্কার কি না দেখুন
রেজিস্ট্রেশন, ট্যাক্স টোকেন, ফিটনেস সনদ, রুট পারমিট যেখানে প্রযোজ্য, ইন্স্যুরেন্স এবং মালিকানা হস্তান্তরের কাগজ আগে দেখুন। গাড়িটি ব্যক্তি, কোম্পানি, ব্যাংক বা অন্য প্রতিষ্ঠানের নামে নিবন্ধিত কি না জেনে নিন। প্রতিষ্ঠানের নামে হলে অনুমোদিত প্রতিনিধির কাগজ এবং হস্তান্তরের প্রক্রিয়া কী হবে, সেটিও পরিষ্কার করুন।
চেসিস নম্বর ও ইঞ্জিন নম্বর গাড়ির সঙ্গে রেজিস্ট্রেশন কাগজের নম্বরের হুবহু মিল থাকতে হবে। নম্বর ঘষামাজা, অস্পষ্ট স্ট্যাম্প বা কাগজের সঙ্গে অমিল থাকলে বিড না করাই নিরাপদ। শুধু ফটোকপি দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন না।
৩. বকেয়া ট্যাক্স, জরিমানা ও মামলা সম্পর্কে জানুন
গাড়ির বকেয়া ট্যাক্স টোকেন, ফিটনেস ফি, ট্রাফিক মামলা বা অন্য দায় কার ওপর বর্তাবে, তা লিখিতভাবে জেনে নিন। অনেক ক্রেতা ধরে নেন পুরোনো সব দায় বিক্রেতাই মিটিয়ে দেবে। বাস্তবে নিলামের শর্তে উল্টো কথাও থাকতে পারে।
নিলাম বিজ্ঞপ্তিতে ‘সব দায় ক্রেতার’ ধরনের শর্ত থাকলে অতিরিক্ত সতর্ক হন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের রেকর্ড যাচাইয়ের সুযোগ থাকলে তা ব্যবহার করুন। সন্দেহ থাকলে সেই গাড়ির জন্য বেশি দর না দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
৪. গাড়ি চোখে দেখুন, সম্ভব হলে মেকানিক নিন
ছবি কখনও পুরো সত্য বলে না। দিনের আলোতে গাড়ি দেখুন এবং একজন বিশ্বস্ত মেকানিক সঙ্গে নিন। তিনি ইঞ্জিনের শব্দ, ধোঁয়া, লিকেজ, গিয়ার শিফট, সাসপেনশন, ব্রেক, কুলিং সিস্টেম এবং বৈদ্যুতিক সংযোগের প্রাথমিক অবস্থা বুঝতে পারবেন।
গাড়ি স্টার্ট নেওয়ার সুযোগ থাকলে ঠান্ডা ইঞ্জিনে স্টার্ট দেখতে চান। কারণ আগে থেকে ইঞ্জিন গরম করে রাখা হলে স্টার্টিং সমস্যা বা কিছু শব্দ বোঝা কঠিন হতে পারে। টেস্ট ড্রাইভ সব নিলামে সম্ভব নয়, কিন্তু সম্ভব হলে অল্প সময় চালিয়ে স্টিয়ারিং, ব্রেক, গিয়ার এবং ইঞ্জিনের প্রতিক্রিয়া দেখুন।
৫. দুর্ঘটনা বা পানিতে ডোবার চিহ্ন খুঁজুন
বডির রঙের অমিল, অসম ফাঁক, নতুন ওয়েল্ডিং, বাঁকা চেসিস অংশ, দরজার অস্বাভাবিক বন্ধ হওয়া বা এয়ারব্যাগ সতর্ক বাতি দুর্ঘটনার ইঙ্গিত হতে পারে। বুট, কার্পেটের নিচে, সিট রেল এবং তারের সংযোগে মরিচা বা কাদার দাগ থাকলে পানিতে ডোবার ইতিহাস থাকতে পারে।
একটি পুরোনো গাড়িতে ছোটখাটো রঙের কাজ স্বাভাবিক। কিন্তু চেসিস বা সেফটি-সংক্রান্ত ক্ষতি আলাদা বিষয়। বাহ্যিকভাবে ঝকঝকে দেখালেও কাঠামোগত সমস্যা থাকলে ভবিষ্যতে বড় খরচ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
৬. মাইলেজকে একমাত্র মানদণ্ড ভাববেন না
কম মাইলেজ সবসময় ভালো গাড়ির নিশ্চয়তা নয়। দীর্ঘদিন অচল থাকা গাড়ির ব্যাটারি, রাবারের পাইপ, সিল, টায়ার ও ফুয়েল সিস্টেমে সমস্যা হতে পারে। আবার তুলনামূলক বেশি চলা হলেও নিয়মিত সার্ভিস করা গাড়ি ভালো অবস্থায় থাকতে পারে।
ওডোমিটারের সংখ্যা, স্টিয়ারিংয়ের ক্ষয়, প্যাডেল, সিট, সার্ভিস রেকর্ড এবং সামগ্রিক ব্যবহারের চিহ্ন একসঙ্গে বিবেচনা করুন। সংখ্যার চেয়ে গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের ইতিহাস বেশি মূল্যবান।
৭. নিলামের জামানত ও ফেরতের নিয়ম বুঝুন
জামানত কত, না জিতলে কখন ফেরত পাওয়া যাবে এবং জিতে গিয়ে কেনা সম্পন্ন না করলে কী হবে, তা আগে পড়ুন। অনেক নিলামে জেতার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধ না করলে জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনিক খরচও কাটা হতে পারে।
বিড দেওয়ার আগে নিশ্চিত করুন যে আপনার অর্থ প্রস্তুত আছে। ঋণ বা ব্যাংক ফাইন্যান্সের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করলে অনুমোদনের সময়সীমা নিলামের পরিশোধসীমার সঙ্গে মিলছে কি না যাচাই করুন।
৮. সর্বোচ্চ বিড আগে লিখে রাখুন
নিলামের পরিবেশে প্রতিযোগিতা দ্রুত সিদ্ধান্ত বদলে দেয়। আরেকজন দর বাড়ালেই নিজের বাজেটের বাইরে চলে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। তাই নিলামে যাওয়ার আগে গাড়ির সম্ভাব্য বাজারদর, মেরামতের ঝুঁকি এবং সব ফি মিলিয়ে নিজের সর্বোচ্চ বিড লিখে রাখুন।
সেই সীমায় পৌঁছালে থামুন। একটি গাড়ি হাতছাড়া হওয়া ক্ষতি নয়, কিন্তু বাজেটের বাইরে গিয়ে সমস্যাযুক্ত গাড়ি কেনা দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করতে পারে। বাজারে আবারও বিকল্প আসবে।
৯. গাড়ি নেওয়ার সময়সীমা ও পরিবহন পরিকল্পনা রাখুন
নিলাম জেতার পর গাড়ি কত দিনের মধ্যে সরাতে হবে, তা জেনে নিন। নির্দিষ্ট সময়ের পরে পার্কিং চার্জ, জরিমানা বা অন্য খরচ যোগ হতে পারে। গাড়ি চলার উপযোগী না হলে টো-ট্রাক বা ক্যারিয়ার লাগতে পারে।
বিশেষ করে অন্য শহরের নিলাম হলে পরিবহন ব্যয় আগে ধরুন। কম দামে গাড়ি জিতেও দূরত্ব, টোয়িং এবং প্রাথমিক মেরামতে খরচ বেড়ে যেতে পারে।
১০. লিখিত প্রমাণ ছাড়া প্রতিশ্রুতিতে ভরসা করবেন না
কোন কাগজ দেওয়া হবে, গাড়ি কখন হস্তান্তর হবে, বকেয়া কার দায়িত্ব এবং বিক্রয়ের শর্ত কী - সবকিছু নিলাম নথি, রসিদ বা লিখিত চুক্তিতে থাকা উচিত। মৌখিক আশ্বাস পরে প্রমাণ করা কঠিন।
অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে অনুমোদিত পদ্ধতি ব্যবহার করুন এবং প্রতিটি লেনদেনের রসিদ রাখুন। ব্যক্তিগত নম্বরে টাকা পাঠানো বা নিলাম প্রতিষ্ঠানের বাইরে অনানুষ্ঠানিক লেনদেন এড়িয়ে চলুন। সন্দেহজনক তাড়াহুড়া বা কাগজ দেখাতে অনীহা থাকলে সরে আসাই নিরাপদ।
কোন ক্রেতার জন্য নিলাম ভালো, আর কার জন্য নয়
যারা গাড়ির অবস্থা যাচাই করতে পারেন, মেরামতের জন্য আলাদা অর্থ রেখেছেন এবং কাগজপত্রের প্রক্রিয়া বুঝে এগোতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, তাদের জন্য নিলাম আকর্ষণীয় হতে পারে। ব্যবসায়িক ব্যবহারের জন্য একাধিক গাড়ি কিনতে চান এমন ক্রেতারাও পরিকল্পিতভাবে সুযোগ কাজে লাগাতে পারেন।
অন্যদিকে প্রথমবার গাড়ি কিনছেন, প্রতিদিনের ব্যবহারের জন্য দ্রুত নির্ভরযোগ্য গাড়ি চান, বা মেরামত নিয়ে অনিশ্চয়তা নিতে চান না - তাদের ক্ষেত্রে যাচাইকৃত তালিকা থেকে গাড়ি দেখা তুলনামূলক সহজ পথ হতে পারে। দাম একটু বেশি হলেও গাড়ি দেখা, বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলা এবং একাধিক বিকল্প তুলনা করার সুযোগ সিদ্ধান্তকে বেশি নিয়ন্ত্রিত রাখে।
নিলামে ভালো চুক্তি পাওয়া সম্ভব, তবে সেটি ভাগ্যের খেলা নয়। তথ্য, পরিদর্শন এবং নির্ধারিত বাজেট - এই তিনটি ঠিক থাকলে আপনি আবেগে নয়, হিসাব করে বিড দিতে পারবেন।



